সচিবালয়ে তদবিরের চাপ ক্রমেই অস্বাভাবিক মাত্রা নিচ্ছে। সীমিত সংখ্যক অনুমোদিত পাশ থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন শত শত মানুষ বদলি ও পদায়নের আবেদন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ভিড় করছেন। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি—যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
টাঙ্গাইল করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মো. শরিফ ইস্পাহানী। তিনি ১৮তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা। কলেজটির অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একজন প্রতিমন্ত্রীর লিখিত সুপারিশ সংবলিত আবেদন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন। তার সঙ্গে কথা হয় শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পিএসের রুমে। মন্ত্রীকে না পেয়ে মঙ্গলবার তিনি তার আবেদনটি পিএসের কাছে জমা দিয়েছেন।
এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ কামরুল হোসেনের একটি আবেদনও কলেজ শাখায় জমা রয়েছে। ময়মনসিংহ সরকারি কলেজে সংযুক্ত এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ সরকারি আনন্দমোহন কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে বদলির জন্য দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত।
এছাড়া নওগাঁ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে পদায়নের জন্য এমপির সুপারিশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে ছোটাছুটি করছেন নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফ। একই ভাবে ইসলামপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদানে আগ্রহী একজন অধ্যাপককেও এক রুম থেকে আরেক রুমে উকিঝুঁকি মারতে দেখা গেল।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বদলি ও পদায়ন ইস্যুতে প্রতিদিন শত শত কর্মকর্তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। তারা বলছেন, এতে স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অফিস রুমের বাইরে বিভিন্ন পেশার মানুষে গিজগিজ করছে। কেউ ব্যক্তিগত, আবার কেউ রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন। অনেকের হাতে মন্ত্রী ও এমপিদের ডিও লেটার। নতুন শিক্ষামন্ত্রী যোগদান করেই দুর্নীতি এবং বদলি পদায়নের বিরুদ্ধে বারবার কথা বললেও তদবিরকারীদের দমন করা যাচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, নির্বাচনের পর হঠাৎ করে এ ধরনের চাপ বেড়ে গেছে। তাদের চাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কাজও পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক ক্যাডারের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তদবির সামলানো খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের স্বাভাবিক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
জানা গেছে, বদলি ও পদায়নে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আবেদনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কথা বলতে চাননি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক যুগান্তরকে বলেন, সচিবালয়ে প্রতিদিন তদবির ও বদলির আবেদন নিয়ে অসংখ্য লোকজন আসেন। কাউকে নিষেধ করা যাচ্ছে না। মানুষের চাপে নির্ধারিত কাজও শেষ করতে দেরি হচ্ছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনিয়ম বাড়তেই থাকবে। তারা দ্রুত একটি ডিজিটাল ও নীতিমালাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে করে ব্যক্তিগত তদবির বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমে আসে।
কথা হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদ্যামান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে বদলি-পদায়নকে ঘিরে এই অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসবে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমে আসবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ অধিশাখা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন শিক্ষার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়নের জন্য শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। বেশির ভাগ আবেদন আবেদনকারী নিজে এসেই জমা দেন। গত এক মাসে কয়েক হাজার বদলি ও পদায়নের আবেদন জমা পড়েছে। ইতোমধ্যে আবেদনের যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। এতে অতিরিক্ত ঝামেলা সৃষ্টি হয়। ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রতিদিন সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য মন্ত্রী ও সচিবের অনুমোদিত পাশ রয়েছে সর্বোচ্চ ১০টি। তদবির করতে আসা শত শত লোক কিভাবে ঢুকছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।
শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন শত শত লোক নানা তদবির নিয়ে মন্ত্রণালয়ে ভিড় জমান। তদবিরের চাপে স্বাভাবিক কার্যক্রম করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। অনেকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসে থাকেন। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমনকি খাওয়া-দাওয়া ও ব্যক্তিগত কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভিড় সামলাতে গিয়ে মন্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান তিনি।
চলতি মাসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির আসতে থাকে। সেই তদবিরগুলো হচ্ছে পোস্টিং নিয়ে। দরকার আছে সেসব করতে হবে। কিন্তু সেগুলো যদি বিশেষ গুরুত্ব দেই তাহলে তো মুশকিল হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসাবে কর্মরত রয়েছেন অধ্যাপক বিএম আব্দুল হান্নান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগে শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদের বদলি মাউশির অধীনে ছিল। গত বছর এক পরিপত্রে এই বদলি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হয়। তাই বদলি ও তদবিরের চাপ বাড়ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।


